গুণগত শিক্ষা একটি জাতির টেকসই উন্নয়ন, মানবসম্পদ বিকাশ এবং সামাজিক অগ্রগতির মূল চালিকাশক্তি। বাংলাদেশের শিক্ষাঙ্গন নানা সমস্যায় জর্জরিত। অপরাজনীতি, শিক্ষক-শিক্ষার্থী সম্পর্কের অবনতি, মাদকাশক্তি, যুগোপযোগী কারিকুলামের অভাব এবং যথাযথ তদারকির সংকট শিক্ষাব্যবস্থার গুণগত মানকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
শিক্ষা ব্যক্তির জ্ঞান, দক্ষতা ও মানবিক মূল্যবোধ বিকাশের প্রধান মাধ্যম। জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য (SDG-4) গুণগত শিক্ষা নিশ্চিত করার ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেছে (UNESCO, ২০১৬)। কিন্তু বাংলাদেশে গুণগত শিক্ষা অর্জনের পথে একাধিক কাঠামোগত ও সামাজিক প্রতিবন্ধকতা বিদ্যমান। সাম্প্রতিক গবেষণা ও বাস্তব পর্যবেক্ষণ থেকে দেখা যায়, শিক্ষাঙ্গনে অপরাজনীতি, শিক্ষক-শিক্ষার্থী সম্পর্কের অবনতি, মাদকাশক্তি, অপ্রাসঙ্গিক কারিকুলাম এবং কার্যকর তদারকির অভাব শিক্ষার মানোন্নয়নে সবচেয়ে বড় অন্তরায় (আহমেদ, ২০১৯, রহমান ও সুলতানা, ২০২১)।
শিক্ষা ব্যক্তির জ্ঞান, দক্ষতা ও মানবিক মূল্যবোধ বিকাশের প্রধান মাধ্যম। ছবিঃ সংগৃহীত
বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অপরাজনীতি একটি দীর্ঘমেয়াদি চ্যালেঞ্জ। ক্যাম্পাসে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রভাবশালী উপস্থিতি, ভর্তি কার্যক্রম, আবাসিক হলে সীট বরাদ্দ এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করে (কবির, ২০২০)। ২০১৮ সালে পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, রাজনৈতিক সংঘর্ষের কারণে ৪৫% শিক্ষার্থীর একাডেমিক কর্মকান্ড ব্যাহত হয়। অপরাজনীতি কেবল সহিংসতা ও ভীতি সৃষ্টি করে না, বরং যোগ্যতার ভিত্তিতে শিক্ষক নিয়োগ ও পদোন্নতিকেও প্রভাবিত করে। এর ফলে শিক্ষার মান ও গবেষণার পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
শিক্ষার মূল চালিকা শক্তি হলো শিক্ষক-শিক্ষার্থী সম্পর্ক। কিন্তু বর্তমানে বাংলাদেশে এই সম্পর্ক ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়ছে। শিক্ষকরা প্রাতিষ্ঠানিক পাঠদানের পাশাপাশি গবেষণার প্রতি আগ্রহ হারাচ্ছেন, আবার অনেক ক্ষেত্রে বাণিজ্যিক টিউশন নির্ভরতায় ঝুঁকছেন (চৌধুরী, ২০১৭)। অপরদিকে, শিক্ষার্থীরা অনলাইন মাধ্যম ও প্রযুক্তি ব্যবহারে দক্ষ হলেও শিক্ষকের কাছ থেকে জ্ঞান আহরণের প্রচলিত পদ্ধতি উপেক্ষা করছে। গবেষণায় দেখা গেছে, ৬২% শিক্ষার্থী মনে করে তাদের শিক্ষকরা পর্যাপ্ত একাডেমিক সহায়তা দিতে ব্যর্থ (রহমান ও সুলতানা, ২০২১)। ফলে পারস্পরিক আস্থা হ্রাস পাচ্ছে, যা গুণগত শিক্ষার পথে বড় অন্তরায়।
মাদকাসক্তি বাংলাদেশের তরুণ সমাজের জন্য এক ভয়াবহ হুমকি। মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর এর তথ্য অনুযায়ী, দেশের নগরভিত্তিক বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের প্রায় ২০% কোনো না কোনোভাবে মাদকের সাথে জড়িত। মাদক সেবন শিক্ষার্থীদের একাডেমিক মনোযোগ নষ্ট করে, মানসিক স্বাস্থ্য ক্ষতিগ্রস্ত করে এবং সহিংসতার প্রবণতা বাড়ায়। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পরিবেশ নষ্ট হয়ে যায় এবং শিক্ষার্থীরা অপরাধপ্রবণতার দিকে ঝুঁকে পড়ে (ইসলাম, ২০১৯)।
মাদকাসক্তি বাংলাদেশের তরুণ সমাজের জন্য এক ভয়াবহ হুমকি। ছবিঃ সংগৃহীত
বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় শ্রমবাজারের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কারিকুলাম এখনো প্রনয়ণ করা সম্ভব হয়নি। বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পাঠ্যক্রম তাত্ত্বিক জ্ঞানের ওপর নির্ভরশীল, যেখানে দক্ষতা, প্রযুক্তি, উদ্যোক্তা উন্নয়ন ও গবেষণার বিষয়গুলো অনুপস্থিত (করিম,২০২০)। UNESCO (2018)-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের প্রায় ৪৭% স্নাতক চাকরির বাজারে প্রবেশের সময় অদক্ষতার কারণে পিছিয়ে পড়ে। বিশেষ করে তথ্যপ্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, জলবায়ু পরিবর্তন ও কারিগরি শিক্ষার উপাদানসমূহ যথাযথভাবে কারিকুলামে অন্তর্ভুক্ত হয়নি। এর ফলে গ্রাজুয়েটদের মধ্যে হতাশা তৈরি হচ্ছে ফলে অনেকে মাদকাসক্তির দিকে ঝুকে পড়ছে।
সারাদেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে প্রশাসনিক দুর্বলতা ও মনিটরিংয়ের ঘাটতি শিক্ষার মান নিয়ন্ত্রণে বড় প্রতিবন্ধকতা। শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়ায় রাজনৈতিক প্রভাব, স্বজনপ্রীতি ও দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে থাকা কলেজগুলোর একটি বড় অংশে নিয়মিত ক্লাস, গবেষণা কার্যক্রম ও শিক্ষার্থীদের সহায়তা পর্যবেক্ষণ করার মতো কার্যকর ব্যবস্থা নেই। তদারকির অভাবে শিক্ষার্থীরা মানসম্মত শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হয়।
গুণগত শিক্ষা নিশ্চিতকরণের জন্য নিম্নোক্ত উদ্দ্যোগগুলো গ্রহণ করা যেতে পারে:
- অপরাজনীতি বন্ধকরণ: শিক্ষাঙ্গন রাজনৈতিক প্রভাবমুক্তকরণ। ছাত্রসংগঠনগুলোর গণতান্ত্রিক কার্যক্রম বজায় থাকলেও সহিংসতা ও দলীয় প্রভাব কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করার উদ্যোগ গ্রহন।
- শিক্ষক-শিক্ষার্থী সম্পর্ক উন্নয়ন: শিক্ষক নিয়োগ ও পদোন্নতিতে স্বচ্ছতা আনা এবং শিক্ষার্থীদের একাডেমিক ও মানসিক সহায়তায় নতুন উদ্যোগ নেয়া।
- মাদক নিয়ন্ত্রণ: ক্যাম্পাসে মাদকের প্রবেশ রোধে আইনশৃঙ্খলা কঠোর এবং সচেতনতামূলক কার্যক্রম জোরদার করা।
- যুগোপযোগী কারিকুলাম প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন: শ্রমবাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে কারিকুলাম প্রনয়ন করা। বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, উদ্যোক্তা উন্নয়ন ও কারিগরি দক্ষতাকে অগ্রাধিকার দেয়া।
- কার্যকর তদারকি: শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রমে জবাবদিহি ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার জন্য স্বতন্ত্র মাননিয়ন্ত্রণ সংস্থা গড়ে তোলা।
শিক্ষা একটি দেশের উন্নয়ন, মানবিক মূল্যবোধ এবং টেকসই সমাজ গঠনের মূলভিত্তি। কিন্তু অপরাজনীতি, শিক্ষক-শিক্ষার্থী সম্পর্কের অবনতি, মাদকাসক্তি, যুগোপযোগী কারিকুলামের ঘাটতি এবং যথাযথ তদারকির সংকট বাংলাদেশের শিক্ষাক্ষেত্রকে গভীর সঙ্কটে ফেলেছে। সমন্বিত উদ্যোগ, নীতিমালায় প্রয়োজনীয় সংস্কার এবং সামাজিক সচেতনতা ছাড়া গুণগত শিক্ষা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।
লগইন
মন্তব্য করার জন্য লগইন করুন!